
স্পেশাল নিউজ করেসপন্ডেন্ট: হুসাইন ইবনে নোয়াব।
আওয়ার টাইমস নিউজ।
পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলমানদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব। এই সময় কোরবানির পশু কেনার জন্য দেশের বিভিন্ন হাটে লাখো মানুষের ভিড় জমে। বেশিরভাগ ক্রেতাই বড়, চকচকে, অতিরিক্ত মোটাতাজা গরুর প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু চিকিৎসক ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, সব মোটাতাজা গরুই সুস্থ নয়। অল্প সময়ে অস্বাভাবিকভাবে মোটা করা কিছু গরু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, একটি গরুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি একটি ধীর প্রক্রিয়া। প্রাকৃতিক খাদ্য, নিয়মিত যত্ন এবং পর্যাপ্ত চলাফেরার মাধ্যমে গরু সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দ্রুত লাভের আশায় গরুকে অল্প সময়ে মোটা করতে স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ, অতিরিক্ত রুচিবর্ধক, হরমোন কিংবা অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ব্যবহার করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে জানা যায়, স্টেরয়েড দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে মানুষের মতো প্রাণীর শরীরেও পানি জমা, কিডনি ও লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে গরুর শরীর ফুলে যায়, কিন্তু সেটি প্রকৃত মাংস বৃদ্ধি নয়; বরং শরীরে অস্বাভাবিক পানি জমার ফল হতে পারে।
পশু চিকিৎসকদের মতে, যেসব গরু স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে না, অল্প হাঁটলেই হাঁপিয়ে যায়, শরীর অতিরিক্ত ফুলে থাকে কিংবা সারাক্ষণ অবসন্ন দেখায়, সেগুলো কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ এসব লক্ষণ অনেক সময় অস্বাভাবিক মোটাতাজাকরণের ইঙ্গিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, গরুর শরীরে ব্যবহৃত কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিক বা ওষুধের অবশিষ্টাংশ মাংসে থেকে যেতে পারে। সেই মাংস দীর্ঘদিন খাওয়া মানুষের শরীরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, কিডনি রোগী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে লিভার, কিডনি, হরমোনজনিত জটিলতা, স্থূলতা ও বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ বেড়ে যাওয়ার পেছনে খাদ্যে ভেজাল ও অনিরাপদ উৎপাদন ব্যবস্থাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। যদিও সব রোগের জন্য সরাসরি কোরবানির পশুকে দায়ী করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়, তবে অনিরাপদ উপায়ে মোটাতাজা করা পশু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে বহু গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে।
তাই কোরবানির পশু কেনার সময় শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বরং কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি:
গরু স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছে কি না
শরীরে অস্বাভাবিক ফোলা আছে কি না
চোখ উজ্জ্বল ও সতেজ কি না
শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক কি না
গরু অতিরিক্ত অলস বা দুর্বল কি না
শরীরে ক্ষত বা ইনজেকশনের অতিরিক্ত দাগ আছে কি না
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বস্ত ও পরিচিত খামার থেকে পশু কেনা তুলনামূলক নিরাপদ। পাশাপাশি প্রশাসনের উচিত ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো এবং হাটে ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল ও ভেটেরিনারি টিম সক্রিয় রাখা।
তবে এটিও মনে রাখা জরুরি, দেশের সব খামারি অসাধু নন। হাজারো পরিশ্রমী খামারি সারা বছর প্রাকৃতিক উপায়ে গরু লালন-পালন করেন। তাদের কারণে দেশ আজ কোরবানির পশুতে অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাই কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে পুরো খামারি সমাজকে দোষারোপ না করে সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিরাপদ পশু নির্বাচনই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
কোরবানির মূল শিক্ষা ত্যাগ, পবিত্রতা ও মানবিকতা। তাই সুস্থ ও নিরাপদ পশু কোরবানি করে নিজের পরিবার এবং সমাজকে নিরাপদ রাখাও আমাদের দায়িত্ব।


























